বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের, যা কেবল রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয় বরং অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও সুদৃঢ়। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার চারদিনের চীন সফরের তৃতীয় দিনে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়ে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এবং ৮টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই উদ্যোগ উভয় দেশের জন্যই উন্নয়ন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চুক্তি
এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিটি উভয় দেশের অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রকে আরো শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখবে। চুক্তির মাধ্যমে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরো মজবুত হবে এবং বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।
৮টি সমঝোতা স্মারক
চুক্তির পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে ৮টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার পথ প্রশস্ত করেছে। এই স্মারকগুলো মূলত সাংস্কৃতিক, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া এবং গণমাধ্যম খাতে সহযোগিতার উপর গুরুত্ব দিয়েছে।
১. সাহিত্য ও শিল্পকর্মের অনুবাদ ও সৃজন: দুই দেশের কালজয়ী সাহিত্য ও শিল্পকর্মের অনুবাদ এবং সৃজন নিয়ে কাজ করার জন্য উভয় দেশ একমত হয়েছে। এর মাধ্যমে সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়বে এবং উভয় দেশের জনগণের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পাবে।
২. সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও খবর আদান-প্রদান: ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি এবং খবরের আদান-প্রদানের মাধ্যমে উভয় দেশের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়বে।
৩. গণমাধ্যম সহযোগিতা: সংবাদ পরিবেশন এবং গণমাধ্যমে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে উভয় দেশের গণমাধ্যম খাত আরো সমৃদ্ধ হবে।
৪. ক্রীড়া খাতে সহযোগিতা: ক্রীড়া বিনিময় এবং প্রশিক্ষণ সহযোগিতার মাধ্যমে খেলাধুলার ক্ষেত্রে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
৫. স্বাস্থ্য খাতে বিনিময় সহযোগিতা: স্বাস্থ্য সেবা এবং পুনর্বাসন ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্যও একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা
এই সফরে দুই দেশের মধ্যে ৫টি বিষয়ে সহযোগিতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এসব সহযোগিতা বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।
১. বিনিয়োগ আলোচনা শুরু করা: চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে আলোচনার সূচনা করবে। এর মাধ্যমে শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে।
২. বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু: চীনের সহায়তায় একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু করা হবে, যা বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে।
৩. মোংলা বন্দরের আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ: মোংলা বন্দরকে আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে সম্প্রসারিত করা হবে, যা বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করবে।
৪. রোবট ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ: আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি রোবট ফিজিওথেরাপি কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা স্বাস্থ্য খাতে নবদিগন্ত উন্মোচন করবে।
৫. কার্ডিয়াক সার্জারি গাড়ি অনুদান: হৃদরোগের চিকিৎসায় সহায়তা দিতে চীন একটি কার্ডিয়াক সার্জারি গাড়ি উপহার দিয়েছে, যা জরুরি স্বাস্থ্য সেবায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে এই সহযোগিতা চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে উভয় দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত, সাংস্কৃতিক এবং স্বাস্থ্য খাতে এই যৌথ উদ্যোগ উভয় দেশের জন্যই কল্যাণকর হবে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগ দেশকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে।